0
বুদ্ধি প্রতিবন্ধি (Mental Retard)
সাতাশ বৎসর বয়ষ্ক লম্বা-চওড়া এক ব্যক্তিকে তার আত্মীয়রা আমার চিকিৎসার অধীনে ন্যস্ত করে ১৮৮৯ সালের মে মাসে; আমার মতামতের ওপর ভরসা করে যে, ঔষধের মাধ্যমে তার অবস্থা কম-বেশী স্বাভাবিক করা যাবে ; যদিও এই সাতাশ বছর বয়সেও মানসিকভাবে সে শিশুদের ন্যায় (বোকাই) রয়ে গেছে। তার মুখের দিকে ভালো করে তাকালে যে কেউ দেখতে পাবে যে, তার কপাল বেশ ফোলানো (অর্থাৎ উচুঁ); চোখের পাতায় কোন পশম নেই; হাবাহাবা চাহনি; মাথার স্বাভাবিক গঠন বেখাপ্পা। তার ইতিহাস হলো শিশুকালে তার মাথায় পানি ছিল (hydrocephalus) এবং সে কখনও অন্যদের মতো ছিল না। তার বোনেরা বলল, সে দুর্বলচিত্তের মানুষ এবং তাকে হাবা বলে ডাকতাম। মাথা খাটানো কাজ করতে না পারার কারণে তার করার মতো কোনো কাজও ছিল না আর এভাবে সে মানসিকভাবে ছিল অনাবাদী। ফলে একজন ভদ্রলোকের সন্তান হয়েও সে রয়ে গেছে পুরোপুরি অশিক্ষিত। সে মাশাআল্লাহ অনেকগুলো অভিযোগ করল - তার মাথার চামড়া তার কাছে খুব টানটান (tight) মনে হয়, তার কপালে এবং মাথার পেছনে উভয় দিকে ব্যথা করে। তার চামড়ার রঙ অনেকটা কালচে ধরনের। তার অনেকগুলো রোগলক্ষণ রাতে বেলা বৃদ্ধি পায়। আমি তাকে খুবই নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করলাম এবং তার মধ্যে তার নিজের ব্যাপারে আগ্রহ জাগিয়ে তুললাম। সে কোন বিবেচনাতেই পাগল ছিল না বরং বলা যায় তার চিন্তাশক্তি ছিল ভালোই কিন্তু তা ছিল একটি মেঘের আড়ালে লুকানো। সে তার হাত দিয়ে মাথাকে আকড়ে ধরত এবং বেশ চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিতে বলত যে, এটা খুবই আঁটসাঁট (tight) এবং আরো অভিযোগ করল যে, তার ঘুম অত্যন্ত বেশী এবং হিসাব-কিতাব বা মাথা-খাটানো কোনো কাজ সে করতে পারে না।

Mental Retardation and Homeopathy
Mental Retardation and Homeopathy


* শারীরিক কারণের মধ্যে প্রথমেই আসে খুব সম্ভবত মস্তিষ্কের (encephalon) পানিজনিত অবস্থাটি। আমি এই রোগীটির প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগ দেই ; কারণ এটা আমার তত্ত্বকে পুরোপুরিভাবে প্রমাণ করে যে, মস্তিষ্কজনিত অক্ষম (মানে, বুদ্ধি-প্রতিবন্দ্বি) শিশু-কিশোরদের মানসিকভাবে পতিত রাখা প্রকৃত চিকিৎসা নয়। যুবকটি একজন পয়সাওয়ালা, ক্ষমতাশালী এবং বুদ্ধিজীবি ভদ্রলোকের সন্তাান হওয়াতে ডাক্তারের পরামর্শে মানসিকভাবে অনাবাদীই রয়ে গেছে। ফলে সে শারীরিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও মানসিকভাবে রয়ে গেছে হাবলা। কেবল তাই নয়, সে যখন পূর্ণবয়ষ্ক যুবক তখন উপদেশ অনুসারে তাকে আরো শক্তিশালী করার জন্য খারাপ আবহাওয়াযুক্ত একটি উপনিবেশিক দেশে চাকরি দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল যেখানে তাকে বড় বড় কাঠের গুঁড়ি বহন করতে হতো। এতে তার শারীরিক শক্তি আরো বৃদ্ধি পেলেও মানসিকভাবে রয়ে গেছে আগে মতোই আহাম্মক বিশেষত দীর্ঘ প্রবাস যাপনের পর যখন সে আমাকে সাক্ষাৎ দিতে আসে। এবার চিকিৎসার পরিণতি লক্ষ্য করুন।

প্রথম ঔষধ ছিল Syphilinum 1000 যাতে “তার হাতে এবং মুখে দেখা দিয়েছিল একটি অস্বস্তিকর অনুভূতি (irritation) যা তাকে রাতের বেলা ঘুমাতে দিত না ; এতে জ্বালা-যন্ত্রণা হতো, দিনের বেলা অসুবিধা করত না। তার মস্তিষ্কের অবস্থা পূর্বের চাইতে ভালো !

পরে দেওয়া হয় Thuja 30 এবং এতে মনে হয় তার ভালো উন্নতি হয়েছে। তাকে দুবার টিকা (vaccine) দেওয়া হয়েছিল। তারপর তাকে দেওয়া হয়েছে Nux vomica 6 এবং Bacillinum 1000। এই পযার্র্য়ে তার মস্তিষ্কের অবস্থা খুবই ভালো যাচ্ছে বিধায় সে পাটিগণিত শেখা শুরু করল। সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম প্রেসক্রিপশনের পুণরাবৃত্তি করা হল।

অক্টোবর ২৩ - শারীরিকভাবে বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ; কবুতরের ন্যায় বক্ষপিঞ্জরের (pigeon breastednesss) আকৃতি অনেকটা কমে এসেছে। সে তার “তিনটি আর” শেখার কাজে বেশ উন্নতি করেছে। পরবর্তীতে দেওয়া হয় Morbillinum 30 ঔষধটি।

নভেম্বর ২৭- সে তার পড়াশোনাকে ইদানিং বেশ উপভোগ করছে, প্রধানত লেখা এবং অংক শাস্ত্রকে। তারপরে Bacillinum 100, Zincum aceticum 3x, Thuja 30, Calcarea phos 3x ইত্যাদি ঔষধগুলি আমাদেরকে ১৮৯১ সালের দিকে নিয়ে যায়, যখন সে তার জ্ঞানার্জনে এতটাই উন্নতি করেছে যে, শহরের একজন পুঁজিপতির অফিসে চাকুরি পেয়ে যায়, যাতে সে অদ্যাবধি সম্পূর্ণরূপে মাথা খাটিয়ে নিজের জীবিকা নির্বাহ করছে।

উপরোক্ত ঘটনাটি আমার এই তত্ত্বকেই প্রমাণ করে যা আমি এখনও পোষণ করি; অর্র্থাৎ বুদ্ধিহীন এবং মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়াদের অব্যবহৃত ফেলা রাখাটা যথেষ্ট নয়। এই ভেবে যে, তারা তাদের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিত্ব রোগ থেকে বেরিয়ে আসতে অক্ষম। বরঞ্চ তারাও অন্যদের মতো একই সাথে নিজেদের ভেতরে এবং বাইরে বৃদ্ধি পেতে সক্ষম। এই যুবক লেখাপড়ার সাথে সম্পর্কিত না থাকার কারণে মানসিকভাবে রয়েছিল অনাবাদী। তার পেশীসমূহকে ব্যবহার করা হয়েছিল, এগুলোর হয়েছিল প্রচুর ব্যায়াম; কিন্তু তার মস্তিষ্কের কোন উন্নতি হয়নি, কেননা সেটা ছিল অব্যবহৃত অবস্থায়। এটাকে অব্যবহৃত ফেলে রাখা হয়েছিল কেননা তা কাজের উপযুক্ত ছিল না। সন্দেহ নেই যে, এই অযোগ্য অবস্থায় ইহাকে কাজে না লাগানোতে বুদ্ধিমত্তা ছিল কিন্তু যথেষ্ট ছিল না।

আপনি হাতের পেশীতে পট্টি বেধে তাকে বড়ো করতে পারবেন না। তেমনি পারবেন না আপনার ধীশক্তিকে অলসভাবে ফেলে রেখে তাকে পরিপুষ্ট করতে। পেশীশক্তি অর্জন করতে হয় পেশীর ব্যায়াম করে; তেমনি বুদ্ধিমত্তা অর্জন করতে হয় তার চর্চা করে। কিন্তু মস্তিষ্কের ক্ষমতা যদি হয় অসুস্থ ; তবে প্রথমে তার চিকিৎসা করতে হবে এবং তারপরেই কেবল নিরাপদে তার অনুশীলন করা যাবে এবং তার শক্তি বৃদ্ধি করা যাবে। পেশীর চর্চা সরাসরি ধীশক্তিকে বলশালী করে না, তেমনি ধীশক্তির চর্চাও করে না পেশীর কোন উপকার; প্রত্যেকের প্রাপ্য চর্চাই প্রত্যেকের সুষম বৃদ্ধিতে সহায়ক। যে-কোন একটির অতিরিক্ত চর্চা অন্যটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে নিশ্চিতভাবে। প্রত্যেকটি প্রাণীর প্রাপ্ত ক্ষমতা একটা পযার্য় পযর্ন্ত- সীমাবদ্ধ এবং তার বেশী নয়। মস্ত মস্ত পন্ডিতরা হয়ে থাকে পেশীশক্তিহীন; আকর্ষণীয় পেশীবহুল ব্যক্তিরা একই সাথে ব্রেনের বিশাল কাজ করতে অক্ষম। ইহা অসম্ভব, বিরুদ্ধে অনেক বকবকানি থাকা স্বত্ত্বেও।

উপরোক্ত উপদেশটি ভালোভাবে স্মরণে রাখা অতীব জরুরি। আমি বলছি শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবিরা একই সাথে কখনও শ্রেষ্ঠ পেশীকর্মী হয় না। আমি এই মত পোষণ করি না যে, একজন প্রচণ্ড পেশীশক্তির অধিকারী ব্যক্তি একই সাথে তীক্ষ্মধীশক্তিসম্পন্ন, উচ্চমানের বুদ্ধিজীবি হতে পারে না। আমি যা বলতে চাই তা হলো, এমন একজনকেও আমি দেখিনি যিনি দু'টোতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন। গ্ল্যাডস্টোন একজন শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবি এবং বড় একটি গাছ কেটে সে লাকড়ি করতে পারবে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না যে, পেশাদার শ্রেষ্ঠ লাকড়ি চেলাইকারীদের সাথে প্রতিযোগিতায় সে ভালো কোন পজিশনে যেতে পারবে। আর তাঁর দিকে ভালোভাবে না তাকালেও বুঝা যায় যে, সে কোন কালেও বিষেশভাবে পেশীবহুল দেহধারী ছিল না।

প্রত্যেকটি প্রাণীই তার প্রাপ্ত ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারে না। শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার ডাঃ গ্রেইসের বংশধরদের মধ্যে হয়ত একজনও শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক খুঁজে পাওয়া যাবে না। পাতলা লোকেরা যেমন কখনও ভালো কয়লা-উত্তোলনকারী হয় না, তেমনি কয়লা-শ্রমিকরাও হয় না ভালো এক্রোবেট বা নৃত্যশিল্পী। প্রত্যেকেই তার নিজের অবস্থানে অনন্য।

মূলঃ- ডাঃ জেমস কম্পটন বার্নেট (James Compton Burnett) এম. ডি. (হোমিও চিকিৎসা বিজ্ঞানী)
অনুবাদঃ- ডাঃ বশীর মাহমুদ ইলিয়াস (লেখক, ডিজাইন স্পেশালিষ্ট, হোমিও কনসালটেন্ট)


Post a Comment

 
Top