4
অচিররোগ বনাম চিররোগের রোগীলিপি ( Acute Vs Chronic Disease Case Taking ):
আমাদের অনেক বন্ধুর ধারণা চিররোগ চিকিৎসার জন্য রোগীলিপি একান্ত প্রয়োজনীয় হলেও অচিররোগের ক্ষেত্রে এটি সম্ভব নয় এবং এর তত প্রয়োজনও নাই। এ প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখা দরকার যে, আমাদের গুরু হ্যানিম্যান তার অর্গাননের ৯৫ থেকে ৯৮ সূত্রে চিররোগে রোগীলিপির উপর বিশেষ জোর দিলেও, ৮৩ থেকে ১০৪ সূত্রে যে উপদেশগুলি দিয়েছেন সেগুলি অচির এবং চিররোগ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমান ভাবেই প্রযোজ্য। তার কারণ-

১) কোনও রোগীর চিকিৎসায় উপযুক্ত ব্যবস্থা (Regimen) এবং সুনির্দিষ্ট নিরাময়ক ঔষধটি (Similimum) নির্ধারণের জন্য আমাদের অনবরতই নির্ভর করতে হয় বিশেষ অবস্থায় এবং পরিস্থিতিতে রোগীর সমগ্র লক্ষণসমষ্টির উপর। সংক্ষিপ্তই হোক বা সুবিস্তৃতই হোক রোগীর বৈশিষ্ট্যজ্ঞাপক সমগ্র বিবরণ হাতের কাছে না থাকলে এটা কখনও সুষ্ঠভাবে করা সম্ভব নয়।

Acute Vs Chronic Disease Case Taking
Acute Vs Chronic Disease Case Taking


২) চিররোগে হোক বা অচিররোগে হোক অধিকাংশ ক্ষেত্রেইপ্রথম প্রযুক্ত একটি সুনির্বাচিত ঔষধেই সমগ্র রোগটির প্রায় কখনই সম্ভব হয় না। এজন্য প্রায়ই প্রয়োজন হয় ঔষধ প্রয়োগের পর রোগটির ক্রমবিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা ( Follow up ) । পূর্ববর্তী অবস্থাগুলি লিপিবদ্ধ না থাকলে, কেবলমাত্র নিজের স্মৃতিশক্তির উপর নির্ভর করে এই কাজটি কখনও নির্ভরযোগ্য ভাবে করা সম্ভব না।

৩) রোগীটির অবস্থা বিবর্তনের সাথে সাথে তার আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাদিও ( Regimen ) পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। এটাও যথাযথভাবে করতে হলে রোগীটির বিভিন্ন অবস্থায় পছন্দ বা অপছন্দ ও হ্রাসবৃদ্ধির শর্তাদি ( Desire or Eversion and Modalities ) লিখিত থাকা প্রয়োজন।

অচির রোগের ক্ষেত্রে অবশ্য এই বিষয়গুলি অনেক কম শ্রম ও সময় সাধ্য।
কারণ-
১) এ অবস্থায় সমগ্র রোগীচিত্রের ( Portrait of the Disease ) নির্দেশক বিষয়গুলি ( Guiding features ) সাধারণতঃ অনেক বেশী প্রকট থাকে।

২) রোগীর অবস্থা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এত খারাপ থাকে খুঁটিনাটি অনুসন্ধানের জন্য যথেষ্ট সময় যায় না।

৩) এই জাতীয় রোগীর সাধারণতঃ অনধিক সময় অন্তর পুনঃপর্যবেক্ষণের প্রয়োজনে হয়। সেই সুযোগে বা পূর্বপর্য্যবেক্ষণের ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতাগুলি সংশোধন করা সম্ভবপর হয়।

 কিন্তু চিররোগের ক্ষেত্রে নির্দেশক লক্ষণগুলি কদাচিৎ সুস্পষ্ট থাকে। সেগুলি যথেষ্ট ধৈর্য্যসহকারে খুঁজে বের করতে হয় এবং পরিস্কৃত করতে হয়।
কারণ-
১) এই রোগীরা সাধারণতঃ যে কষ্টগুলির জন্য আসে এবং পীড়াপীড়ি করতে থাকে ( যথা কোনও স্থানে ব্যথা, স্ফীতি বা অর্বুদ, দুর্বলতা প্রভৃতি ) সেগুলি তার নিরাময়ক ঔষধ নির্বাচনে প্রায় কোনই সহায়তা করেনা। ঔষধ নির্বাচনের জন্য আমাদেরখুঁজে বেড়াতে হয় এমন সব লক্ষণ যা বহুদিন ভুগে ভুগে সহ্য হয়ে গেছে বা একদম ভুলে গেছে, অথবা অধুনা ঢাকা পড়ে গেছে, এখন বড় জোর আনুষঙ্গিক লক্ষণে ( Accessory Symptom ) পরিণত হয়েছে। এই জাতীয় লক্ষণের ভিতর পড়ে কোনও স্থানীয় জ্বালা বা ব্যথা প্রভৃতি, ক্ষুধা, পিপাসা, যৌনক্রিয়া প্রভৃতি সম্পর্কে কোনও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট ইত্যাদি।

২) এই অবস্থার জন্য উপযুক্ত ঔষধ নির্বাচনের উদ্দেশ্যে আমাদের অনুসন্ধান করতে হয়-
  ক) ক্ষুধা, পিপাসা প্রভৃতি উল্লিখিত শারীরবৃত্তিক বৈশিষ্ট্যগুলির সম্পর্কে এবং তাদের হ্রাসবৃদ্ধির শর্তগুলির সম্পর্কে।
  খ) রোগীর খাদ্য, পানীয় প্রভৃতি এবং পরিবেশ ইত্যাদি সম্পর্কে বিশেষ এবং অপছন্দ ও তার ফলে রোগের হ্রাস বা বৃদ্ধি সম্পর্কে ( Craving, Aversion, Agreement, Disagreement etc.)।

৩) এই তথ্যগুলি যথাযথভাবে আহরণের জন্য প্রয়োজন হয়- রোগীর পূর্ব-ইতিহাস ( Past History ) সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানের।

৪) এত করেও সবসময়ে রোগটির আসল চিত্র সুস্পষ্ট হতে চায়না, বা যে চিত্র পাওয়া যায় সেটা নির্ভরযোগ্য বা ফলপ্রসু হতে চায়না। সে অবস্থায় আমাদের প্রয়োজন হয় রোগীর পূর্ব ইতিহাসের এবং পারিবারিক ইতিহাসের ( Past History and Family History ) অনুসন্ধান করে তার ধাতুগত মূল কারণগুলি ( Miasmatic Fundamental Causes ) উদঘাটনের জন্য প্রচেষ্টা করা।

 এতেই আশা করি যথেষ্ট পরিস্কার হয়েছে, অচির রোগ অপেক্ষা চিররোগে রোগীলিপি প্রস্তুত করা কত বেশি সমস্যা সঙ্কুল, যদিও আমাদের অনেক বন্ধুই এই দুটি ক্ষেত্রের মূল পার্থক্যগুলি উপেক্ষা করে একইভাবে চির এবং অচির রোগের চিকৎসা চালিয়ে যান, এবং চিকিৎসা চলাকালে যখন যে লক্ষণগুলির উদ্ভব হয় সেই অনুসারে ঔষধ পরিবর্তন করে যান।
অবশ্য এই আলোচনা থেকে এটা মনে করলে মারাত্বক ভুল হবে যে চিররোগ চিকিৎসার সমস্যাগুলি অচিররোগে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কখনও কোনও অবস্থাতেই উদয় হবেনা। বিশেষতঃ বর্তমান যুগে এটা মনে রাখা একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
আমাদের চিকিৎসক জীবনের প্রথম দিকে ( ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সালের বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ) আমরা অধিকাংশ অচিররোগ নির্দেশক লক্ষঙুলি প্রকটভাবে পেতাম। কিন্তু বর্তমান যুগে এটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এজন্য এমনকি অচিররোগে চিকিৎসার বেলাতেও আমাদের চিররোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলির অনুসন্ধান প্রায়ই প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

দুই একটি উদাহরণ দিলে আশা করি মন্তব্যটা কিঞ্চিত পরিস্কার হবে-
১) একটি হৃদযন্ত্রের আবরক ঝিল্লীর তরুন প্রদাহের ( Acute Pericarditis ) রোগী। সাধ্যমতভাবে আহরিত লক্ষিণ সমষ্টির ভিত্তিতে- একোনাইট, ব্রায়োনিয়া, স্পাইজেলিয়া, আর্সেনিক প্রভৃতি ঔষধ যথেষ্ট মাত্রায় এবং উপযুক্ত সময় অন্তর প্রয়োগ করে বেশ কয়েক সপ্তাহ কেটে গেলেও কিছুমাত্রা উপশম করতে পারছিলাম না, এবং হতাশার মুখোমুখি এসে পড়েছিলাম। এমতাবস্থায় হঠাৎ নজরে এলো রোগীর বার বার প্রস্রাবের বেগ হচ্ছে এবং তার সাথে মূত্রনালী ও থলিতে তীব্র জ্বালা। রোগীকে এবং তার আত্মীয়দের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে এই কষ্টটি রোগের প্রথম থেকেই আছে। কিন্তু বুকের কষ্টের জন্য রোগীর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ায় ঐ কষ্টের তারা কোন গুরুত্বই দেননি এবং দুর্ভাগ্যবশতঃ আমাদেরও নজর এড়িয়ে গেছে। এখন রোগীর মূল কষ্টের সাথে এই আনুষঙ্গিক লক্ষণ ( Concomitant ) মিলিয়ে ক্যান্থারিসের চিত্র সুপ্রকট পেলাম। ঐ ঔষধ ৩০ শক্তিতে ২/৩ ঘন্টা অন্তর প্রয়োগ করে কয়েক ঘন্টার ভিতর রোগীর সমস্ত কষ্ট বিদূরিত করে তাকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হল।

২) একটি মৃত্যুর দুয়ারে উপস্থিত এনসেফালাইটিস ( Encephalitis ) রোগী সাধ্যমতো ভাবে নির্বাচিত ঔষধ- বেলেডোনা, এপিস, কিউপ্রাম, হেলিবোরাস ব্যর্থ হবার পর হঠাৎ নজরে পড়ল যে, সে অহরহই তার পা দুটি নাড়াচ্ছে। জিজ্ঞাসা করে জানলাম যে এমন কি ঘুমের ভিতরও এই ব্যপারটি চলতে থাকে। এই হঠাৎ প্রাপ্ত আনুসঙ্গিক ( Concomitant ) লক্ষণের উপর নির্ভর করে জিঙ্কাম মেটালিকাম ১০০০ বা 1M এর কয়েকটি গ্লোবিউল একগ্লাস সাধারণ জলের ভিতর দিয়ে প্রথমে ১৫ মিনিট অন্তর তারপর ২/৩ ঘন্টা অন্তর এক চামচ করে মোট ৮/১০ মাত্রা প্রয়োগে ৪/৫ দিনের ভিতর রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলো।

৩) একটি অল্প বয়স্ক রোগীর মারাত্মক বেসিলার মেনিনজাইটিস এবং তৎসহ প্রচন্ড জ্বর এবং বেশ কিছু এনসেফালাইটিসের লক্ষণে বিভিন্ন ঔষধে ব্যর্থ হবার পর জানতে পারলাম যে শিশুকালে তার কান থেকে প্রচুর পুঁজ স্রাব হতো এবং বিভিন্ন ঔষধ প্রয়োগে সেটা সম্পূর্ণ সেরে যায়। এর সাথে আরেকটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেলো যে রোগীটি সর্বরোগে সর্বাবস্থায় প্রচুর ঠান্ডা জলে স্নান না করে থাকতে পারে না। এমন কি বর্তমান অবস্থাতেও ঠান্ডা জলে গা ভেজাতে চায়। ক্যাল্কেরিয়া সালফ ১০০০, ১ আউন্স পরিশুদ্ধ জলে দিয়ে ৪ টি দাগ কেটে ১ ঘন্টা অন্তর ১০ টা করে ঝাঁকুনি দিয়ে একমাত্রা করে সেবন করিয়ে কয়েক ঘন্টার ভিতর তার পুরানো পুঁজ স্রাব হাজির হলো এবং সে সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত হলো।

৪) একটি অল্প বয়স্ক মারাত্মক কলেরা রোগীর সমস্ত লক্ষণ কার্বোভেজের থাকা সত্ত্বেও, কার্বোভেজ ২০০ থেকে ৫০,০০০ পর্যন্ত অল্প সময় অন্তর বেশ কয়েক মাত্রায় দেওয়া সত্ত্বেও দেখা গেল প্রতি মাত্রা, ক্রমশঃ স্বল্পতর সময় কাজ করছে। বস্তুতঃ রোগীটি আমার সামনেই দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় হঠাৎ আমার Allen's Key Note - এ প্রদত্ত মেডোরিনামের একটি লক্ষণের কথা মনে পড়ে গেল সেটা কার্বোভেজের হুবহু অনুরূপঃ রোগীর পিতাকে গোপনে ডেকে নিয়ে সব অবস্থা বুঝিয়ে বললাম যে তিনি যদি ছেলের প্রান চান তবে অকপটে সত্য ঘটনা বলবেন। তিনি স্বীকার করলেন তাঁর যৌবনে উপমেহ ( Gonorrhea ) হয়েছিল। মেডোরিনাম ২০০ মাত্র ১ মাত্রা ছেলেটিকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এলো।

৫) আজকাল প্রায় প্রত্যহ দেখতে পাই যে কি অচিররোগ কি চিররোগ ক্ষেত্রে ( বয়স নির্বিশেষে তবে প্রায়ই অল্পবয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে ) সাধ্যমত নির্বাচিত ঔষধে উল্লেখযোগ্য স্থায়ী কাজ পাই না। কিন্তু যখনই তাদের পুনঃপুণঃ টিকা, ইনোকুলেশন প্রভৃতি গ্রহণের ইতিহাসের উপর নির্ভর করে রেপার্টরীতে প্রদত্ত ভ্যাকসিনের প্রতিষেধক কোনও একটি ঔষধ, যেটুকু সাধারণ লক্ষণ পাওয়া যায় তার উপর ভিত্তি করে প্রয়োগ করে, তারপরই অধিকাংশ রোগী নিরাময়ের দিকে অগ্রসর হতে থাকি অথবা পূর্ব নির্বাচিত ঔষধ উপযুক্ত ভাবে কাজ করতে শুরু করে। এই জাতীয় রোগীতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবশ্য থুজার নির্দেশ পাই। এজন্য অনেকে আমাদের 'থুজার ডাক্তার' বলে বিদ্রুপ করেন। কিন্তু আমরা নাচার। যে পন্থায় কাজ পাই, কারও বিদ্রুপে সে পথ ত্যাগ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। দীর্ঘকালের তিক্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোনও রোগী আমাদের হাতে আসামাত্র আমরা তাকে টিকা, ইনোকুলেশন প্রভৃতি থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেই। অনেক বন্ধুই সেটা করেন না, এমন কি এই ব্যাপার নিয়েও আমাদের বিদ্রুপ করেন। এক্ষেত্রেও আমরা নাচার।

সে যাই হোক, উপরের এই আলোচনা থেকে আশা করি এটা পরিস্কার হয়েছে যে রোগীলিপি প্রস্তুত করণ ব্যাপারে চিররোগ এবং অচিররোগের ভিতর কোনও দুর্লভ্য প্রাচীর নেই। একমাত্র পার্থক্য, চিররোগে সমগ্র রোগীলিপিটির প্রধান কাঠামোটি চিকিৎসা আরম্ভের প্রথমেই করে নেওয়া প্রয়োজন হয়, অচিররোগে সেটা চিকিৎসা চলাকালে ক্রমশঃ প্রয়োজন মত তৈরী করা যায়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার - ডাঃ জ্ঞানেন্দ্র নাথ কাঞ্জিলাল।

Post a Comment

Sk Mondal said... December 25, 2013 at 7:42 AM

চিকিত্‍সা শাস্ত্রে এই লেখাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি এই লেখাটি আমরতো কাজে লাগবে আন্যদেরও উপকারে আসবে।

Belayet Hossen said... December 25, 2013 at 6:35 PM

ধন্যবাদ। @Sk Mondal

MD.KAMRUL Islam said... January 26, 2014 at 9:56 AM

ধন্যবাদ!
লিখাটি আমর খুব দরকার ছিল। আপনার কাছথেকে আরো চমৎকার চমৎকার পোস্ট চাই।

Belayet Hossen said... January 26, 2014 at 12:56 PM

আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ @Kamrul Islam

অবশ্যই চেষ্টা করব সুন্দর লেখা জন্য দুয়া করবেন। ইচ্ছা করলে আপনিও লেখতে পারেন, আপনার নাম ও ইমেইল এড্রেসসহ প্রকাশ করব।

 
Top