0
আমাদের দৈনিক জীবনে কাজের ভিড়ে অনেক কষ্টই চাপা পড়ে যায় । কিছু সমস্যা আছে কাওকে বলা যায় না সারা জীবন কুড়েঁ কুড়েঁ মরতে হয়। আর সে রকমই একটা সমস্যার নাম সিফিলিস।

Syphilis and Homeopathy treatment
Syphilis and Homeopathy treatment


সিফিলিস কিঃ
সিফিলিস ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত একটি জটিল যৌন সংক্রামক রোগ। এটি নারী পুরুষ উভয়ের যৌনাঙ্গ, ঠু্ট, মুখ ও পায়ু আক্রমন করে।
সিফিলিস এর প্রধাণ বৈশিস্ট্য হলঃ
১ম ধাপ- Chancre বা ব্যথাহীন ক্ষত হবে,
২য় ধাপ- চর্মে লালচে দাগ হবে,
সুপ্তাবস্থা- এখানে কোন লক্ষণ দেখা যাবে না এবং
৩য় ধাপ- কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে এবং কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমে সক্রামন ঘটায়।

রোগের কারণঃ
স্পাইরোচিট পর্বের ট্রেপোনেমা একটি ব্যাক্টেরিয়া যার চারটি উপ প্রজাতির ট্রেপোনেমা প্যালিডাম প্যালিডাম দ্বারা সিফিলিস আক্রান্ত হয়।

সংক্রমণ উৎপত্তিঃ
আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বক ও শ্লেষ্মাঝিল্লির ক্ষত, লালা, বীর্য, যোনি থেকে নিঃসৃত রস ও রক্ত।

কিভাবে ছড়ায়ঃ
*আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যৌন মিলন করলে।
*আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে চুম্বন বিনিময় করলে।
*রক্তসঞ্চালন কিংবা ইনজেকশনের মাধ্যমে।
*গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে।
*আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত ব্লেড ব্যবহার করলে।

শ্রেণীবিভাগ
অর্জিত(ACQUIRED):
   (ক)প্রারম্ভিক(Early)                      
        প্রাথমিক(Primary)                        
        সেকেন্ডার(Secondary)                                
        প্রচ্ছন্ন(latent)                              
   (খ)দেরী(late)                                
        প্রচ্ছন্ন(latent)                              
        ক্ষতিকর তৃতীয়(benign tertiary)                      
        কার্ডিওভাসকুলার(cardiovascular)
        নিউরোসিফিলিস (neurosyphilis)                    
জন্মগত(CONGENITAL):
    (ক)প্রারম্ভিক(Early)
    (খ)দেরী(Late)

সিফিলিস লক্ষণগুলো:
প্রাথমিক স্তরে এটি সংক্রমণের স্থানে আলসার তৈরি করে। যাইহোক, ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে সময়ের সঙ্গে দেহের অনেক গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করে। মেডিকেল বিশেষজ্ঞরা সিফিলিসকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করে যথা- প্রাথমিক, দ্বিতীয়, প্রচ্ছন্ন এবং তৃতীয়। একজন চিকিৎসাহীন আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত প্রথম দুটি স্তর অর্থাৎ প্রথম ১ থেকে ২ বছর অন্যদের সংক্রামিতকরতে পারে। শেষ পর্যায়ে চিকিৎসাহীন ব্যক্তি সংক্রামক নয়, কিন্তু এপর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তির হৃদযন্ত্রের গুরুতর অস্বাভাবিকতা, মানসিক বিকৃতি বা ভারসাম্যহীনতা, অন্ধত্ব, অন্যান্য স্নায়ুর সমস্যা, এবং মৃত্যুর পর্যন্তও হতে পারে।

প্রাথমিক সিফিলিস(Primary):
সিফিলিসের প্রথম উপসর্গ একটি ক্ষত যা স্যাংকার("Shan-ker") নামে পরিচিত। ক্ষতটি আক্রমনের ১০ দিন থেকে ৩ মাসের মধ্যে দেখা দিতে পারে, কিন্তু সাধারণতভাবে ২ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে প্রদর্শিত হয়। ক্ষতটি যন্ত্রণাহীন হয় এবং শরীরের ভিতরে ঘটতে পারে যা আক্রান্ত ব্যক্তি লক্ষ্য করে না। এটি সাধারণত লিঙ্গ, vulva বা যোনিতে দেখা দেয়। এছাড়াও ক্ষতটি গর্ভাশয়(), জিহ্বা, ঠোঁট, বা শরীরের অন্য অংশের উপর বিকশিত হতে পারে। ক্ষতটি চিকিত্সা করা হোক বা না হোক এটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিলিন হয়ে যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিত্সা না হলে, আক্রান্ত ব্যক্তির এক-তৃতীয়াংশ ক্রনিক পর্যায়ে চলে যায়।

সেকেন্ডারি সিফিলিস(Secondary):
এ পর্যায়ে চামড়ায় ফুসকুড়ি, ক্ষুদ্র মুদ্রা(penny) আকারের বাদামী ক্ষত থাকে যা সিফিলিসের ক্রনিক পর্যায় চিহ্নিত করে। ফুস্কুড়ি গুলি ক্ষত(chancre) মিলিয়ে যাবার ৩ থেকে ৬ সপ্তাহ পর দেহের যেকোন স্থানে আবার শুধুমাত্র শরীরের কয়েকটা স্থানে দেখা দিতে পারে। প্রায় বেশিরভাগ সময়ই এগুলি হাতের তালু এবং পায়ের তালুতে দেখা যায়।

সক্রিয় ব্যাকটেরিয়া ঘাঁ তে উপস্থিত থাকে, যা যেকোনো শারীরিক সংস্পর্শ, যৌন মিলন বা সংক্রমিত ব্যক্তির ছিলে যাওয়া চামড়া দ্বারা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফুস্কুড়িগুলি সাধারণত কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে ভাল(?) হয়ে যায়।

অন্যান্য উপসর্গ হচ্ছে- হালকা জ্বর, ক্লান্তি, মাথা ব্যাথা, স্বরভঙ্গ, গুচ্ছাকারে চুল পড়া, এবং শরীরের সর্বত্র লসিকা গ্রন্থি(lymph glands) ফোলা দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ খুব হালকা হতে পারে এবং প্রাথমিক পর্যায়ের ক্ষতের মতই চিকিত্সা ছাড়াই অদৃশ্য হয়ে যাবে। সিফিলিসের দ্বিতীয় পর্যায়ের লক্ষণগুলি আসা এবং যাওয়া রোগের আক্রমনের পরবর্তী ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে হতে পারে।

সুপ্ত সিফিলিস(Latent):
এ অবস্থার শুরুতে এটি তীব্র সংক্রামক এবং ভয়ের বিষয় এই যে, আক্রান্ত ব্যক্তির কোন লক্ষণ থাকে না যা দেখে সাবধান হওয়া যাবে। চিকিত্সাহীন অনেক মানুষ এ অবস্থায় রোগের কোন লক্ষণ ও উপসর্গ ছাড়াই মানসিক ভাবে অনেক কষ্ট পায়।

তৃতীয় পর্যায়ের সিফিলিস (Tertiary):
চিকিৎসাহীন আক্রান্ত ব্যক্তিদের এক তৃতীয়াংশের ৩ থেকে ১৫ বছর পর এ পর্যায়ের প্রকাশ পেতে পারে।  ব্যাকটেরিয়া হার্টের ক্ষতি, চোখ, মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্রের, হাড়, জয়েন্টগুলোতে, অথবা শরীরের প্রায় অন্য যেকোন অংশ ক্ষতি করতে পারে। এই পর্যায় কয়েক বছর বা কয়েক দশক ধরে স্থায়ী হতে পারে। এ অবস্থায় মানসিক অসুস্থতা, অন্ধত্ব, অন্যান্য স্নায়ু সমস্যা, হৃদরোগ, এবং মৃত্যু ঘটাতে পারে।

জন্মগত সিফিলিস :
গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে গর্ভফুলের মাধ্যমে শিশু সিফিলিসে আক্রান্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশেরই গর্ভপাত হয় অথবা মৃত সন্তান প্রসব ঘটে। প্রাথমিক গর্ভাবস্থায় মায়ের চিকিৎসা করালে শিশু রক্ষা পায়।

সিফিলিসের সেরোলজিক্যাল পরীক্ষা :
*VDRL(ভেনেরাল ডিজিজ রিসার্স ল্যাবরেটরি) পরীক্ষা
*RPR(র‌্যাপিড প্লাজমা রিয়াজিন)
*TPHA(ট্রেপোনেমা প্যালিডাম হেমাগ্লুটিনেশন অ্যাসেই)
*TPPA (ট্রেপোনেমা প্যালিডাম পার্টিক্যাল এগ্লুটিন্যাশন অ্যাসেই)
*ELISA(ট্রেপোনেমাল এনজাইম-লিংকড ইম্যুনোসরবেন্ট অ্যাসেই)
এছাড়াও চেষ্ট এক্সরে, ইসিজি, সিএসএফ ইত্যাদি পরিক্ষা করা যেতে পারে।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা:
হোমিওপ্যাথি ওষুধ সবচেয়ে জনপ্রিয় রোগ নিরাময়ের একটি পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র ও সদৃশ উপসর্গের উপর ভিত্তি করে চিকিৎসা করা হয়। এটি উপসর্গ ও জটিলতা মুছে ফেলে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য অবস্থায় রোগীর ফিরে যাবার একমাত্র উপায়। সদৃশবিধানের লক্ষ্য শুধু সিফিলিস চিকিত্সা নয়, তার অন্তর্নিহিত কারণ ও স্বতন্ত্র প্রবণতা মোকাবেলায়ও সহায়তা করে। স্বতন্ত্র ঔষধ নির্বাচন এবং চিকিত্সার জন্য, রোগীকে একজন যোগ্যতাসম্পন্ন ও রেজিস্টার্ড হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। সিফিলিস চিকিত্সার সহায়ক ঔষধগুলো নিম্নরুপঃ
Merc Sol - সিফিলিস চিকিত্সায় প্রথম ওষুধ হচ্ছে মার্ক সল। সিফিলিসের দ্বিতীয় পর্যায়ের অধিকাংশ লক্ষণ মার্ক সলের অনুরূপ। নরম ক্ষত (chancres)ও ব্যথা সহ জ্বর থাকে যা রাতে বৃদ্ধি পায়। সব ধরনের স্রাব দুর্গন্ধ যুক্ত এবং বেশি হয়। রাতে হাড়ের মধ্যে বিরক্তিকর ব্যথা থাকে।
Merc Cor - ক্ষতস্থানের প্রান্ত অমসৃন থাকে, ক্ষতস্থান থেকে খুব পাতলা ও দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব নিঃসরিত হয়।
Arsenic Album - গঠনগত সিফিলিসের জন্য একটি দরকারী ওষুধ। এর ক্ষতের সাথে তীব্র জ্বালা-যন্ত্রনা থাকবে। অস্থিরতাসহ সকল সমস্যা মধ্য রাতের পর বৃদ্ধি পায়।
Hepar Sulph - ক্ষতস্থান খুবই স্পর্শকাতর থাকবে। এতে জ্বালাসহ প্রান্তে হুলফুটানো ব্যথা থাকে। ক্ষতের স্রাবে পুরানো পনিরের গন্ধ থাকবে এবং ক্ষতের চারপাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুস্কুড়ি থাকে।
Aurum Mur - সিফিলিটিক গনোরিয়া; লিঙ্গাগ্রভাগে এবং অন্ডকোষে ক্ষত(chancres); বাম কুঁচকিতে ক্ষত(bubo); এখানেও দ্বিতীয় পর্যায়ের সিফিলিস দেখা যায়। বংশগত কারণে শিশুদের সিফিলিসের আক্রমণ ঘটে।
Aurum Met- দ্বিতীয় পর্যায়ের সিফিলিস; শিশুদের সিফিলিস, বিশেষ করে পারদ অপব্যবহার করে; চোখের চারপাশে অনেক ব্যথা সহ প্রদাহ মনে হয় হাড়ে ব্যথা; নাকের হাড়ের ক্ষয়।
Carbo Veg - ক্ষতস্থান অমসৃন, ধারালো, প্রান্তভাগ গর্ত; , অত্যন্ত ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত, পাতলা স্রাব; অনেক বেদনাদায়ক এবং ক্ষত হতে সহজে রক্ত ​​ঝরে।
Badiaga - শিশুদের সিফিলিস, গ্রন্থিগুলি ফুলে শক্ত হয়ে যায়; বাম কুঁচকিতে শক্ত, অসমতল গুটি ও ক্ষত(bubo),যাতে রাত্রে সেলাই করার মত অত্যন্ত ব্যথা থাকে।
Carbo Animalis - গঠনগত বা তৃতীয় পর্যায়ের সিফিলিস; চামড়ায় তামাটে লাল বর্ণের ঘাঁ, বিশেষ করে মুখের গ্রন্থিগুলি শক্ত হয়; নাকে ক্ষত।
Kreosote - তৃতীয় পর্যায়ের সিফিলিস; হাড়ের গুরুতর ব্যাথা, রাতে বৃদ্ধি; মাথায় চুল পড়ে যায়(alopecia) সাথে তালুতে অনেক ব্যথা থাকে। আক্রান্ত শিশুদের কেন্দ্রীয় কর্তন দাঁত অসমান খাঁজকাটা এবং সরু ও অনিয়মিত প্রান্ত থাকে।
সিফিলিস অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ:
নাইট্রিক এসিড, ক্যালি আয়োড, ফাইটোলাক্কা, সাইলিসিয়া, ক্যালি সালফ, সালফিউরিক এসিড, থুজা, অরাম আর্স, এপিস মেল, এন্টিম টার্ট, ক্যাল্কেরিয়া আয়োড, ক্যাল্কেরিয়া সালফ, কস্টিকাম, ফ্লোরিক এসিড, কলচিকাম, ফসফরাস, এসাফোয়টিডা, কোনিয়াম, ল্যাকেসিস, প্লাটিনাম মেট, গ্রাফাইটিস, বেলাডোনা, ক্যালমিয়া, সালফার ইত্যাদি।

Post a Comment

 
Top